মহাভারতের এই বিস্ময়কর কাহিনীতে জানুন কীভাবে কঠোর তপস্যা, মহাদেবের পরীক্ষা এবং ভয়ংকর যুদ্ধের পর অর্জুন পাশুপত অস্ত্রসহ সকল দিব্যাস্ত্র লাভ করেছিলেন।
![]() |
| দেবতাদের কাছ থেকে অর্জুনের দিব্যাস্ত্র লাভ |
মহাদেবের সঙ্গে ভয়ংকর যুদ্ধের পর অর্জুন কীভাবে লাভ করেছিলেন পাশুপত অস্ত্র ও সকল দিব্যাস্ত্র? | জানুন মহাভারতের সেই কাহিনী
অর্জুন, পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও তাঁদের সঙ্গীসাথীরা সকলে মিলে যমুনা নদীর তীরে খাণ্ডববনে যখন বিভিন্ন আনন্দ ক্রীড়ায় রত ছিলেন সে সময় পিঙ্গল বর্ণের দাঁড়ি ও জটা সমন্বিত অগ্নিবর্ণের এক দীর্ঘদেহী ব্রাহ্মণ তাঁদের কাছে এসে উপস্থিত হলেন। তিনি তাঁর পরিচয় প্রদান করে জানালেন যে তিনি হচ্ছেন স্বয়ং অগ্নিদেব আর তিনি এখন ক্ষুধার্ত। এই বিশাল খাণ্ডববন হচ্ছে তাঁর এখনকার আহার। কিন্তু যেহেতু ইন্দ্রের বন্ধু তক্ষক এই বনে বাস করছেন তাই ইন্দ্র তাকে এই বন আহার করতে দিচ্ছে না। আর তাই অগ্নির পক্ষেও এই বন আহার করা সম্ভব হচ্ছে না। এখন অর্জুন ও তাঁর সঙ্গীগণ যদি অস্ত্রধারণ করে অগ্নিদেবের সহায় হন তাহলে অগ্নিদেব এই খাণ্ডববন তোজন করতে পারেন।
অর্জুন জানালেন তাঁদের কারোর কাছেই এখন কোন অস্ত্র শস্ত্র নেই। তাই তাঁরা বিনা অস্ত্রে কি করে অগ্নিদেবের সহায় হবেন? এই কথা শুনে অগ্নিদেব বরুণদেবকে স্মরণ করলে বরুণদেব সঙ্গে সঙ্গে আবির্ভূত হয়ে অর্জুনকে ধনুক, অক্ষয়তুণীর ও কপিধ্বজ রথ দান করলেন আর কৃষ্ণকে দিলেন চক্র ও কৌমদকী গদা। কৃষ্ণ ও অর্জুন সেইসব অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে রথে আরোহণ করে অগ্রসর হলেন। সেই সঙ্গে অগ্নিদেবও তাঁর স্বরূপ ধারণ করে লেলিহান আগুনে খাণ্ডববন দগ্ধ করতে শুরু করলেন। যদিও সৌভাগ্যক্রমে সে সময় ইন্দ্রের বন্ধু তক্ষক সেই বনে ছিলেন না। কিন্তু তাঁর পুত্র পরিবার সেই বনে ছিল। তাই বন্ধু পুত্রের প্রাণ রক্ষা করার জন্য ইন্দ্র অর্জুনের সঙ্গে প্রচণ্ডভাবে যুদ্ধ করতে লাগলেন। একটানা ১৫ দিন চলেছিল এ যুদ্ধ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অর্জুনের পরাক্রমের কাছে ইন্দ্রকে নতি স্বীকার করতে হল।
তবে ইন্দ্র যে সহজে পরাজয় স্বীকার করেছিলেন তা নয়। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে দুটি দৈববাণী হল। প্রথম দৈববাণীতে ঘোষিত হল যে তক্ষকের পুত্র অশ্বসেন জীবিত রয়েছেন। সে কথা শুনে ইন্দ্র কিছুটা শান্ত হলেন। কেননা বন্ধুপুত্র অশ্বসেনের প্রাণরক্ষার জন্যই ইন্দ্র যুদ্ধ করছিলেন। দ্বিতীয় দৈববাণীতে ঘোষণা করা হল যে কৃষ্ণ ও অর্জুনকে যুদ্ধে পরাজিত করা কারোর পক্ষেই সম্ভব নয়। এ কথা শুনে ইন্দ্র যুদ্ধ হতে নিজেকে সংবরণ করে নিলেন। শুধু তাই নয় অর্জুনের যুদ্ধ পরাক্রমে মুগ্ধ হয়ে ইন্দ্র অর্জুনকে বর প্রদান করলেন যে মহাদেবের প্রসন্নতার প্রভাবে অর্জুন সমস্ত দিব্য অস্ত্র লাভ করবেন।
শীঘ্রই ইন্দ্র প্রদত্ত বর অর্জুনের জীবনে কার্যকরী হল। কৌরবদের সঙ্গে দ্যূতক্রীড়ায় পরাজিত হয়ে পাণ্ডবগণ যখন বনবাসে ছিলেন, সেসময় একদিন ব্যাসদেব তাঁদের কাছে উপস্থিত হলেন। ব্যাসদেব যুধিষ্ঠির মহারাজকে বললেন, "আমি তোমাকে একটি মন্ত্র দান করতে এসেছি। যার প্রভাবে অর্জুনের মাধ্যমে তোমাদের সকল কার্যসিদ্ধি হবে। অর্জুনকে তুমি ইন্দ্র, বরুণ, যম, কুবের ও মহাদেবের কাছে প্রেরণ কর। সে তাঁদের থেকে দিব্য অস্ত্রসমূহ লাভ করবে। আর তোমরাও এই বন ত্যাগ করে অন্য কোন বনে যাও।"
আরো পড়ুন: মহাভারতের যুদ্ধ কেন হয়েছিল মাত্র ১৮ দিন? জেনে নিন সেই কারণ!
ব্যাসদেবের নির্দেশ অনুযায়ী এরপর যুধিষ্ঠির সকলকে নিয়ে কাম্যকবনে প্রবেশ করলেন। আর অর্জুনকে শান্তি স্বস্ত্যয়নের মাধ্যমে ব্যাস প্রদত্ত মন্ত্র শিক্ষা প্রদান করলেন। কঠোর তপস্যা করে দিব্য অস্ত্র সংগ্রহের জন্য ইন্দ্রাদি প্রমুখ দেবতার কাছে যেতেও অর্জুনকে তিনি নির্দেশ দিলেন। বড় ভাইয়ের আদেশ শিরোধার্য করে অর্জুন অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ইন্দ্রকীল পর্বতে যেতেই কে যেন গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলেন 'তিষ্ঠ'। অর্জুন কাছেই একটি গাছের নীচে এক মহাতপস্বীকে দেখতে পেলেন। সেই তপস্বী অর্জুনকে সমস্ত অস্ত্র পরিত্যাগ করে তপস্যায় নিযুক্ত হতে বললেন। অর্জুন অস্ত্রত্যাগ না করে দণ্ডায়মান রইলে পর সেই তপস্বী নিজের আত্মপরিচয় জানিয়ে বললেন যে তিনিই ইচ্ছেন ইন্দ্র। ইন্দ্রের পরিচয় পেয়ে অর্জুন করজোড়ে তার কাছে দিব্যাস্ত্র প্রার্থনা করলে পর ইন্দ্র বললেন, "তুমি তপস্যা শুরু করলে পর অচিরেই শিবের দর্শন লাভ করবে আর শিবই তোমায় দিব্যাস্ত্র দান করবেন।"
এই কথা শোনার পর অর্জুন এক গভীর বনে প্রবেশ করে মহাদেবের দর্শন লাভের জন্য কঠোর তপস্যা শুরু করলেন। তপস্যাকালে একদিন সেই বনের মধ্যে অর্জুন এক কিরাত ও কিরাতীর দর্শন লাভ করলেন। আসলে স্বয়ং শিব ও দুর্গাই কিরাত ও কিরাতীর ছদ্মবেশে অর্জুনের কাছে এসেছেন। কিন্তু অর্জুন তাদের চিনতে পারলেন না। বরং সেইসময় বনের মধ্যে একটি বরাহ আগমন করলে সেই বরাহটিকে নিয়ে ছয়বেশী শিব ও অর্জুনের মধ্যে ঝগড়া বেধে গেল। হয়েছিল কি, আসলে সেই বরাহটি ছিল মূক নামে এক দানব। বরাহের ছদ্মবেশে সে অর্জুনকে আক্রমণ করতে এলে অর্জুন তার দিকে শর নিক্ষেপ করতে উদ্যত হলেন। ঠিক সেই সময় কিরাতরূপী মহাদেব অর্জুনকে বাধা দিয়ে বললেন, "এই বরাহকে তুমি বধ করতে পারবে না। একমাত্র আমিই এই বরাহকে বধ করতে পারি।" এ কথা শুনে অর্জুন বিরক্ত হলেন। কোথাকার কোন এক জঙ্গলের কিরাত, সে কিনা অর্জুনের মতো বীরকে নিষেধ করছে। অর্জুন নিষেধ না শুনেই বরাহের দিকে তীর নিক্ষেপ করলেন। এদিকে কিরাতবেশী শিবও বরাহের দিকে তীর নিক্ষেপ করলেন। দুটি তীরই একই সাথে বরাহকে বিদ্ধ করলে পর সেই বরাহরূপী দানব প্রাণত্যাগ করল। তখন অর্জুন ক্রুদ্ধভাবে ছদ্মবেশী মহাদেবকে বললেন, "ওহে কিরাত, তুমি মূগয়ার নিয়ম ভঙ্গ করে আমাকে বাধা দিয়েছ। তাই আমি তোমাকে বধ করব।" কিরাতবেশী শিব উত্তর দিলেন, "আমি এই জঙ্গলের অধিবাসী এক কিরাত।
আরো পড়ুন: ভগবান জগন্নাথ দেবের চোখ গোল ও বড় কেন এবং তাঁর মূর্তিতে হাত-পা নেই কেন
বরং আমার হাত থেকে তোমার আজ নিস্তার নেই।" এই কথা শুনে অর্জুন আরও ক্রুদ্ধ হয়ে কিরাতবেশী শিবকে একের পর এক তীর নিক্ষেপ করে পর্যুদস্ত করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু আশ্চর্য হয়ে দেখলেন তাঁর একটি তীরও সেই কিরাতের শরীরে কোন ক্ষত পর্যন্ত সৃষ্টি করতে পারল না।
কিরাত অবিচলিতভাবে দাঁড়িয়ে হা হা করে হেসে উঠল। এরপর অর্জুন কিরাতকে তাঁর মুষ্টির দ্বারা আঘাতের পর আঘাত করতে লাগলেন। কিন্তু কিরাতের কিছুই হল না। এরপর অর্জুন খড়গ দিয়ে কিরাতকে আঘাত করলেন। কিরাত আগের মতোই অবিচল। অর্জুন তখনও কিরাতবেশী মহাদেবকে চিনতে না পেরে রাগে অন্ধ হয়ে হাতের সামনে যা যা পেলেন, বৃক্ষ, শিলা সব কিছু দিয়ে কিরাতকে আধাত করতে লাগলেন। কিন্তু কিরাতের কোনকিছুতেই কিছু হল না। এরপর অর্জুন কিরাতকে মল্লযুদ্ধে আহবান করলেন। কিন্তু মল্লযুদ্ধ শুরু হতে না হতেই মহাদেবের অসীম শক্তিশালী বাহুর বন্ধনের এক প্যাচেই অর্জুন অচৈতন্য হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর অর্জুনের চৈতন্য ফিরে এল। কিন্তু তখনও কিরাতরূপী শিবকে তিনি চিনতে পারলেন না। বরং কিরাতের হাত থেকে রক্ষা পাবার উদ্দেশে অর্জুন শিবলিঙ্গ নির্মাণ করে শিবপূজা করতে লাগলেন।
![]() |
| কুন্তী পুত্র অর্জুন কর্তৃক শিব লিঙ্গ পূজা করার ছবি |
কিন্তু কিছুক্ষণ পূজা করার পর অর্জুন লক্ষ্য করলেন তিনি ফল ফুল জল যা কিছু শিবলিঙ্গের উপরে নিবেদন করছেন তার কিছুই শিবলিঙ্গে থাকছে না। সবই গিয়ে পড়ছে কিছু দূরে দাঁড়ানো সেই শক্তিশালী কিরাতের মস্তকে। এইবার অর্জুনের মোহভঙ্গ হল। তিনি বুঝতে পারলেন আসলে কিরাত-কিরাতীর বেশে শিব দূর্গাই তাকে দর্শন দান করতে এসেছেন। আর তিনি এতক্ষণ মিছিমিছি সেই কিরাতরূপী শিবের সঙ্গে যুদ্ধ করে গেলেন। পরম লজ্জায় অর্জুন মহাদেবের চরণে লুটিয়ে পড়লেন। মহাদেব তাঁকে আলিঙ্গন করে বললেন, "আমি তোমার তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়েছি। তুমি আমার কাছে বর প্রার্থনা কর।" অর্জুন তখন সবিনয়ে মহাদেবের কাছে পাশুপত অস্ত্র প্রার্থনা করলেন। শিব সানন্দে তাকে পাশুপত অস্ত্র প্রদান করে, সেটি কিভাবে প্রয়োগ করতে হয় সেটিও শিখিয়ে দিলেন।
![]() |
| অর্জুনের দিব্যাস্ত্র প্রাপ্তির ছবি |
এরপর অর্জুন ইন্দ্রের নির্দেশে ইন্দ্রেরই রথে করে স্বর্গে গমন করলেন। সেখানে পাঁচ বৎসর সুখে অতিবাহিত করে সকল দিব্যাস্ত্র সংগ্রহ করার পর পৃথিবীতে ফিরে এসেছিলেন। পৃথিবীতে ফিরবার আগে অবশ্য ইন্দ্রের অনুরোধে ইন্দ্রের পরম শত্রু সমুদ্র তলের নিবাত কবচ নামক তিন কোটি দানবদের এবং হিরণ্যপুরের দানবদের এক প্রচণ্ড যুদ্ধে অর্জুন পরাজিত করলেন। এইভাবে দানবকুল সংহার করে অর্জুন সকল দেবতাদের আশীর্বাদ ও দিব্যাস্ত্র সংগ্রহ করে ইন্দ্রেরই রথে পুনরায় নিজে প্রিয় ভ্রাতাগণের কাছে ফিরে এলেন।
সেইসময় পাণ্ডবগণ গন্ধমাদন পর্বতে বাস করছিলেন। অর্জুনের আগমনে অতঃপর অর্জুন যুধিষ্ঠিরাদি তাঁরা সকলেই পরম আনন্দিত হলেন। বয়ঃজ্যেষ্ঠদের ভক্তিভরে প্রণাম নিবেদন করে তাঁর দিব্যাস্ত্র সংগ্রহের সকল কাহিনী বর্ণনা করতে লাগলেন।



0 মন্তব্যসমূহ