ভগবান জগন্নাথের মূর্তি কাঠের কেন? নবকলেবর রহস্য ও পৌরাণিক কাহিনি

ভগবান জগন্নাথের মূর্তি কাঠের কেন? নবকলেবর রহস্য ও পৌরাণিক কাহিনি

ভগবান জগন্নাথের মূর্তি কাঠের তৈরি কেন? নবকলেবর কী এবং এর পেছনের পৌরাণিক রহস্য কী? জেনে নিন জগন্নাথদেব, বলরাম ও সুভদ্রার অলৌকিক কাহিনি।


ভগবান জগন্নাথের মূর্তি কাঠের কেন? নবকলেবর রহস্য ও পৌরাণিক কাহিনি
জগন্নাথদেবের নবকলেবর ও ব্রহ্ম পদার্থের রহস্য

শাস্ত্রে বলা হয় যে, ভগবান কৃষ্ণ যখন তার মনুষ্য দেহ ত্যাগ করেন, তখন তাঁর মনুষ্যরুপি দেহ কে দাহ করা হয়েছিল। তারপর তাঁর দেহাবশেষ গঙ্গা নদীতে বিসর্জন দেওয়া হয়। তাঁর দেহাবশেষ গঙ্গার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সমুদ্রে পৌঁছায়।

 ভগবান জগন্নাথের সাথে অনেক আকর্ষণীয় কাহিনী জড়িত আছে। আপনি কি কখনও তাঁর সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেছেন? যদি না করে থাকেন, তবে আজ আমরা তাঁর সম্পর্কে এমন অনেক কিছু বলতে যাচ্ছি যা সম্ভবত আপনি জানেন না। প্রকৃতপক্ষে, ভগবান জগন্নাথের প্রতি মানুষের বিশ্বাস অপরিসীম। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ তাঁর মন্দিরে এসে নিজেদের মনোবাঞ্ছা পূরণের জন্য প্রার্থনা করেন।

জগন্নাথ দেবের মূর্তি কোন কাঠ দিয়ে তৈরি হয়?

আপনারা হয়তো জানেন না যে, ভগবান জগন্নাথের মূর্তি কাঠের তৈরি। এবং তাও নিমের কাঠ দিয়ে। মূর্তিটি ১১টি নিম গাছ থেকে তৈরি করা হয়। পুরাণগুলিতেও এর উল্লেখ আছে। প্রকৃতপক্ষে, ভগবান জগন্নাথ হলেন ভগবান বিষ্ণুর অষ্টম অবতার, পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের একটা শ্রীরূপ।


জগন্নাথদেবের মূর্তি নিমের কাঠের তৈরি করা হয় কেন?

কথিত আছে যে, পরমেশ্বর ভগবান কৃষ্ণ যখন তার মনুষ্য রুপি দেহ ত্যাগ করেন, তখন তাঁকে দাহ করা হয়েছিল এবং তাঁর দেহাবশেষ গঙ্গা নদীতে বিসর্জন দেওয়া হয়। গঙ্গার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সেই দেহাবশেষ সমুদ্রে পৌঁছায়। জগন্নাথ পুরীর তৎকালীন রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন স্বপ্নে এই দৃশ্য দেখেন, এবং তিনি পরের দিন সমুদ্র তীরে এসে দেখেন, সমুদ্রে একটি বিশাল গাছের গুঁড়ি ভাসছে। এই দৃশ্য দেখে রাজা ফিরে আসেন। তারপর, একটি দৈব বাণী হয়, তাঁকে এই কাঠ দিয়ে মূর্তিটি তৈরি করে স্থাপন করতে বলা হয়। রাজা তাঁর মন্ত্রীদের সাথে এই বিষয়ে আলোচনা করেন এবং একজন কারিগর খুঁজে আনতে তাঁদের পাঠান। 
ভগবান বিশ্বকর্মা এক বৃদ্ধ রূপ ধারণ করে নিজে এটি তৈরি করার প্রস্তাব দেন, কিন্তু তিনি একটি শর্ত দেন, তাঁর কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেউ দরজা খুলবে না। বহুদিন কেটে গেল, কিন্তু দরজা না খোলায় রানীর অনুরোধে দরজাটি ভেঙে ফেলা হয়, তখন ভগবান বিশ্বকর্মা তৎক্ষণাৎ ওই স্থান পরিত্যাগ করেন শর্ত অনুযায়ী, এবং ভগবান জগন্নাথ বলদেব ও সুভদ্রা মহারানীর মূর্তিগুলো, অসম্পূর্ণ থেকে যায়। 
ভগবান জগন্নাথ রাতে রাজার স্বপ্নে আবার আবির্ভূত হয়ে বলেন যে, তাঁকে তার রাজ্য এ জগন্নাথ নামে প্রতিষ্ঠা করা উচিত। তখন ভগবানের স্বপ্নাদেস অনুসারে জগন্নাথ পুরীতে প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং যে কাঠ দিয়ে তাঁকে তৈরি করা হয়েছিল তা ছিল নিম কাঠ। এবং এই কারণেই সেই প্রাচীন কাল থেকে ভগবান জগন্নাথের শ্রীমূর্তি কেবল কাঠ দিয়েই তৈরি করা হয়।

জগন্নাথদেবের হাত দুটি সর্বদা সামনের দিকে ফেরানো থাকে কেন?

আপনি যদি ভগবান জগন্নাথের বিগ্রহ দেখে থাকেন, তাহলে হয়তো তাঁর চোখ ও হাতের দিকে খেয়াল করেছেন, তাঁর হাত দুটি সর্বদা সামনের দিকে ফেরানো থাকে। এই বিষয়ে পুরানে বলা আছে যে, ভগবান জগন্নাথ রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের স্বপ্নে বলেছিলেন যে তাঁর দৃষ্টি সর্বদা ভক্তদের উপর থাকবে, তাই তাঁর চোখের পাতা থাকবে না এবং তিনি সর্বদা জাগ্রত থাকবেন। তিনি জগতের নাথ অর্থাৎ প্রভু জগন্নাথ। যিনি এক সেকেন্ডের জন্যেও চোখের পলক ফেলেন না। কারণ, তার এই দুটি নয়ন দিয়ে সদা সর্বদা তিনি মহাবিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের উপর নজর রাখেন। তিনি আরও বলেন যে, যে মূর্তিটি তৈরি করা হচ্ছে তা ভক্তদের আশীর্বাদ করার জন্য নয়, বরং তাঁদের আলিঙ্গন করার জন্য। তখন থেকেই তাঁর হাত দুটি এমনভাবে রাখা হয় যেন ভক্তরা তাঁকে আলিঙ্গন করছেন, এবং তাঁর হাত দুটি সর্বদা সামনের দিকে ফেরানো থাকে।


নবকলেবরের সময় কী ঘটে?, | নবকলেবর কী?
জগন্নাথদেবের নবকলেবর লীলার এক পবিত্র ও রহস্যময় মুহূর্ত

নবকলেবর কী?

ওড়িশার পুরীতে অবস্থিত ভগবান জগন্নাথ ধাম শুধু একটি মন্দিরই নয়, বরং লক্ষ লক্ষ ভক্তের জন্য এটি বিশ্বাসের এক প্রাণবন্ত কেন্দ্র। রথযাত্রার সময়, সারা বিশ্ব থেকে ভক্তরা এখানে ভগবান জগন্নাথ, বলভদ্র এবং দেবী সুভদ্রার দর্শন করতে আসেন। কিন্তু খুব কম লোকই জানেন যে ভগবান জগন্নাথের বিগ্রহ প্রতি ৮, ১২, বা ১৯ বছর পর পর পরিবর্তন করা হয়। এই দিব্য প্রথাকেই “নবকলেবর” বলা হয়, যার অর্থ ভগবানের নতুন দেহ ধারণ করা। নবকলেবর সাধারণত ৮, ১২, বা ১৯ বছরের ব্যবধানে অনুষ্ঠিত হয়, হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী, যে বছর আষাঢ় মাসে পরপর দুটি পূর্ণিমা (অধিমাস বা জোড়া আষাঢ়) থাকে, তখনই এটি অনুষ্ঠিত হয়। 

নবকলেবরের সময় কী ঘটে?

এ সময় মূলত পুরোনো বিগ্রহ থেকে নতুন বিগ্রহে 'ব্রহ্ম' স্থানান্তর করা হয়। এই প্রক্রিয়াটি মধ্যরাতে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে সম্পন্ন করা হয়, পুরোনো বিগ্রহগুলোকে মন্দিরের ভেতরের কৈবল্য বৈকুণ্ঠ নামক স্থানে শাস্ত্রীয় বিধানে সমাধি দেওয়া হয়।

নবকলেবরের সময়ে ভগবান জগন্নাথ, বলভদ্র, দেবী সুভদ্রা এবং সুদর্শনের নতুন মূর্তি তৈরি করা হয়। এই মূর্তিগুলি পাথর বা ধাতু দিয়ে তৈরি হয় না, বরং পবিত্র নিম কাঠ দিয়ে তৈরি হয়, যা জীবন ও পবিত্রতার প্রতীক বলে বিবেচিত।

নবকলেবর সম্পর্কে প্রচলিত বিশ্বাস

সময়ের সাথে সাথে কাঠের ক্ষয় আমাদের জীবনের সত্য—জন্ম, মৃত্যু এবং পুনর্জন্মের কথা মনে করিয়ে দেয়। দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে, নবকলেবর এই বার্তা দেয় যে দেহ নশ্বর, কিন্তু আত্মা অমর। এই কারণেই নবকলেবর শুধু একটি আচার-অনুষ্ঠান নয়, বরং বিশ্বাস, দর্শন এবং জীবনের সত্যের এক ঐশ্বরিক মিলন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ