শ্রীকৃষ্ণ কেন দ্বারকাপুরী নির্মাণ করেছিলেন? জরাসন্ধ, কালযবন ও দ্বারকার রহস্য

 শ্রীকৃষ্ণ কেন দ্বারকাপুরী নির্মাণ করেছিলেন? জরাসন্ধ, কালযবন ও দ্বারকার রহস্য

শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকাপুরী নির্মাণের পৌরাণিক দৃশ্য
শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকাপুরী নির্মাণের পৌরাণিক দৃশ্য(AI দ্বারা তৈরি প্রতীকী চিত্র)

জরাসন্ধ ও কালযবনের আক্রমণ থেকে যাদবদের রক্ষার জন্য কেন শ্রীকৃষ্ণ দ্বারকাপুরী নির্মাণ করেছিলেন? জানুন দ্বারকার পৌরাণিক ইতিহাস ও রহস্য।

কংস বধের পর জরাসন্ধ কেন শ্রীকৃষ্ণের শত্রু হয়ে ওঠেন?

মগধরাজ প্রবল প্রতাপশালী জরাসন্ধ ছিল শ্রীকৃষ্ণের মামা কংসের শ্বশুর, অর্থাৎ কংসের দুই রাণী 'অস্তি' ও 'প্রাপ্তি'র বাবা হল, মগধরাজ জরাসন্ধ। কৃষ্ণ কংসকে বধ করলে পর, কংসের এই দুই রাণী, 'অস্তি' ও 'প্রাপ্তি' বিধবা হয়ে বাবা জরাসন্ধের কাছে মগধে চলে গেল। শোকার্ত 'অস্তি' ও 'প্রাপ্তি' বাবা জরাসন্ধের কাছে গিয়ে কিভাবে কৃষ্ণ কংসকে বধ করেছিলেন সে কথা বর্ণনা করে তাদের অসহায় অবস্থার কথা নিবেদন করল। শোকগ্রস্তা দুই মেয়েকে দর্শন করে এবং জামাতা কংসের নিহত হবার খবর শ্রবণ করে তার দুই মেয়ের সামনে দাঁড়িয়েই জরাসন্ধ ক্রোধে কম্পিত হয়ে পৃথিবীকে যাদবশূন্য করার শপথ গ্রহণ করল।

জরাসন্ধের ১৩ অক্ষৌহিনী সেনা ও মথুরা অবরোধ
জরাসন্ধের মথুরা আক্রমণ

জরাসন্ধের ১৩ অক্ষৌহিনী সেনা ও মথুরা অবরোধ

জরাসন্ধ সমগ্র যদু বংশকে নিঃশেষ করার শপথের লক্ষ্যে চারদিক থেকে সমস্ত মথুরা নগরীকে আক্রমণের উদ্দেশ্যে বিপুল সেনা সমাবেশ ঘটালো। সে তেরোটি অক্ষৌহিনী সেনা বাহিনী গড়ে তুলে চারদিক দিয়ে মথুরা অবরোধ করল। একটি অক্ষৌহিনী সেনা বাহিনীতে থাকে ২১,৮৭০ জন হাতীর সওয়ারী হওয়া সেনা, ২১,৮৭০ জন রথারোহী সেনা, ৬৫,৬১০ জন অশ্বারোহী সেনা এবং ১,০৯,৩৫০ জন পদাতিক সেনা। এক একটি অক্ষৌহিনী সেনা বাহিনীতেই এতগুলো সেনা, তাহলে বুঝতেই পারা যাচ্ছে এরকম তেরোটি অক্ষৌহিনী সেনা সাজিয়ে জরাসন্ধ কতটা বিশাল সেনার সমাবেশ ঘটিয়েছিল।
ভাগবতে বর্ণনা করা হয়েছে এই সেনা সমাবেশ দেখতে ছিল মথুরা নগরীকে ঘিরে এক উচ্ছসিত মহাসমুদ্রের মতো। মথুরার প্রজারা এই বিপুল শত্রুসেনা দেখে ভীত সন্ত্রস্ত হয়েছিলেন।

কেন শ্রীকৃষ্ণ জরাসন্ধকে বারবার জীবিত ছেড়ে দেন?

পরমেশ্বর ভগবান কৃষ্ণ এই জগতের ভূ-ভার হরণের উদ্দেশ্যে অবতরণ করেছিলেন। তাঁর প্রিয় মথুরাবাসীরা শত্রুসৈন্যের ভয়ে সন্ত্রস্ত হয়ে উঠেছে দেখে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর ভূভার হরণের উদ্দেশ্যের পরিকল্পনার কথা ভাবতে শুরু করলেন। প্রকৃতপক্ষে জরাসন্ধের তেরো অক্ষৌহিনী সেনা ছিল তাঁর কাছে ভূ-ভার হরণের একটি সুযোগ। শ্রীকৃষ্ণ ঠিক করলেন তিনি প্রথমে জরাসন্ধের তেরো অক্ষৌহিনীর বিশাল সেনাবাহিনীকেই বিধ্বস্ত করবেন কিন্তু জরাসন্ধকে এখনই বধ করবেন না। কেননা সর্বজ্ঞ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ জানতেন, এই তেরো অক্ষৌহিনী সেনাকে বিনাশ করলে পর ভবিষ্যতে জরাসন্ধ আরও বিশাল সৈন্য সমাবেশ ঘটাবে। এর ফলে তিনি ভূ-ভার হরণের আরও সুযোগ লাভকরবেন। ভগবান কৃষ্ণের এরকম সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর অস্ত্র-শস্ত্র, পতাকা ও অন্যান্য যুদ্ধের উপকরণে সজ্জিত দুটি উজ্জ্বল দিব্য রথ অন্তরীক্ষ থেকে তাঁর কাছে নেমে এল। দুটি রথ নেমে আসতে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা শ্রীবলরামকে, জরাসন্ধের তেরো অক্ষৌহিনী সেনার সামনে নিরীহ যাদবগণ যে বিপন্ন বোধ করছে সে কথা বলে, তাঁদের ভূ-ভার হরণের উদ্দেশ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে, রথে আরোহণ করে জরাসন্ধের সৈন্যদের বিনাশের উদ্দেশ্যে যুদ্ধে যাবার অনুরোধ করলেন। এরপর শ্রীকৃষ্ণ ও বলরাম বর্ম ইত্যাদি যুদ্ধের সাজ পোষাক পরিধান করে উদ্যত অস্ত্র প্রদর্শন করতে করতে তাঁদের রথ চালিয়ে অল্পসংখ্যক যাদবসেনা সহ যুদ্ধের জন্য এগিয়ে চললেন। মথুরা নগরী থেকে বেরিয়ে এসে শ্রীকৃষ্ণ শঙ্খধ্বনি করলেন, যা শুনে জরাসন্ধের সেই বিশাল সৈন্যবাহিনীর সেনাদের মনও ভয়ে কম্পিত হয়ে উঠল।

শ্রীকৃষ্ণ ও বলরামের যুদ্ধ
শ্রীকৃষ্ণ ও বলরামের যুদ্ধ

এরপর বিপুল বিক্রমে সেই দুই ভাই কৃষ্ণ ও বলরাম জরাসন্ধ-বাহিনীর বিরূদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। শ্রীকৃষ্ণ একসময় লক্ষ্য করলেন যে তাঁর স্বল্পসংখ্যক যাদব-সেনা বিপক্ষের বিশাল সৈন্যদের দ্বারা নিগৃহীত হচ্ছে। তিনি তখন তাঁর শার্প নামক সর্বোত্তম ধনুক হাতে তুলে নিয়ে তাঁর তৃণ থেকে তীরসমূহ ধনুর্গুণে সংযোজিত করে অগণিত শাণিত বাণরাশি শত্রুসৈন্যের বিরুদ্ধে নিক্ষেপ করলেন। কৃষ্ণের নিক্ষেপিত অগণিত বাণরাশি এক জ্বলন্ত অগ্নিবলয়ের মতো সমগ্র সামরিক শক্তিকেই প্রায় বিধ্বস্ত করে ফেললো। শত সহস্র সৈন্য, হাতী, ঘোড়া প্রভৃতি নিহত হবার ফলে তাদের দেহের রক্তে প্রকৃতপক্ষে সেখানে এক রক্তনদীর সৃষ্টি হল। সেই সময় শ্রীবলরাম সেই যুদ্ধক্ষেত্রে রথহীন ও হতসৈন্য অবস্থায় জরাসন্ধকে বলপূর্বক বন্দী করলেন। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের অনুরোধে বলরাম পরে জরাসন্ধকে মুক্ত করে দেন। যুদ্ধে পরাস্ত হলে  জরাসন্ধ নিজ রাজ্যে ফিরে গিয়ে একইভাবে আবারও বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে মথুরা আক্রমণ করল এবং এইভাবে সে পর পর সতের বার যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে পুনরায় মথুরা আক্রমণ করেছিল।

আঠারো বারের সময়ে জরাসন্ধ যখন পুনরায় মথুরা আক্রমণ করতে উদ্যত হল, সে সময়ে সে একটি সুবিধা লাভ করল। সে সময় নারদমুনির পরামর্শে কালযবন নামে এক মহাপরাক্রমশালী বর্বর যোদ্ধাও তিন কোটি সৈন্য সমাবেশ করে মথুরা অবরোধ করল। নারদমুনি কেন কালযবনকে মথুরা আক্রমণের পরামর্শ দিয়েছিলেন সে সম্বন্ধে বিষ্ণুপুরাণে একটি কাহিনী রয়েছে।

কালযবনের অবরোধ
কালযবনের অবরোধ

কালযবনের জন্ম ও যাদবদের বিরুদ্ধে তার অভিযান

গর্গমুনি ছিলেন যাদবগণের কুলগুরু। একবার গর্গমুনির ভগ্নীপতি যখন কোন একটা বিষয়ে গর্গমুনিকে উপহাস করেছিল, তখন সেই উপহাস শুনে যাদবরা গর্গমুনির সামনেই হা হা করে হেসে উঠেছিল। ফলে অপমানিত বোধ করে যাদবদের বিরুদ্ধে ক্রুদ্ধ হয়ে গর্গমুনি মনে মনে ঠিক করলেন তিনি এমন এক ব্যক্তি সৃষ্টি করবেন যে যাদবদের মধ্যে ত্রাসের সঞ্চার করবে। এই উদ্দেশ্যে বারো বৎসর ধরে তিনি কেবল লৌহচূর্ণ ভক্ষণ করে দেবাদিদেব শিবের তপস্যা করে অবশেষে এক প্রচণ্ড শক্তিধর পুত্র লাভের বর প্রাপ্ত হলেন। গর্গমুনি এক যবন পত্নীর গর্ভে একটি পুত্র কালযবনের জন্ম দান করলেন। এই কালযবন কালক্রমে প্রচণ্ড ভয়ঙ্কর শক্তি ধারণ করে একদিন নারদমুনিকে জিজ্ঞাসা করল 'পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী এখন কারা?' নারদমুনি উত্তর প্রদান করলেন 'যাদবগণই এখন পৃথিবীতে সবচেয়ে পরাক্রমশালী।' আসলে কালযবন তার সঙ্গে লড়াই করবার যোগ্য কাউকে খুঁজছিল। কিন্তু তা না পেয়ে সে নারদের কাছে গিয়ে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ যোদ্ধার সঙ্গে যুদ্ধ করার বাসনায় ঐ কথা জিজ্ঞাসা করে।

শ্রীকৃষ্ণ কেন দ্বারকাপুরী নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন?

নারদমুনির কাছ থেকে যাদবগণের মথুরাপুরীর সন্ধান লাভ করে কালযবন তিন কোটি সেনা নিয়ে মথুরা অবরোধ করল। এখন পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে জরাসন্ধও যে শীঘ্রই মথুরা জয়ের চেষ্টা করবে সর্বজ্ঞ শ্রীকৃষ্ণ তা বুঝতে পারলেন। উভয় শত্রুর আক্রমণে মথুরার প্রজা ও আত্মীয়স্বজনদের দুর্গতি অনুমান 'করে আগে থাকতে উপযুক্ত সুরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ উচিত মনে করে, তিনি জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা বলরামের সঙ্গে পরামর্শ করে দ্বারকায় সমুদ্রের মধ্যে দ্বাদশ যোজন বা ৯৬ বর্গ মাইল ব্যাপী দানবদের অপ্রবেশ্য এক অদ্ভূত দুর্গ নগরী নির্মাণ করলেন স্বয়ং বিশ্বকর্মাকে দিয়ে। 
dwarkadhish photo
বিশ্বকর্মার নির্মিত দ্বারকা নগরী (AI দ্বারা তৈরি দ্বারকার প্রতীকী চিত্র)


বিশ্বকর্মার নির্মিত দ্বারকা-পুরীর অপূর্ব বর্ণনা

সমুদ্রগর্ভে নির্মিত এই অপূর্ব নগরীতে ছিল সুপরিকল্পিত জনপথ, কল্পবৃক্ষপূর্ণ বহু উদ্যান, মঙ্গলসূচক স্বর্ণ কলস সহ অসংখ্য সুউচ্চ গোপুর বা তোরণদ্বার, বহু প্রাসাদ, সোনা ও রূপার পাত্রে প্রচুর শস্য সঞ্চয়ের জন্য গর্ভকক্ষ, মহারাজ উগ্রসেনের বসবাসের জন্য দ্বারকাপুরী শ্রেষ্ঠ বর্ণাঢ্য প্রাসাদ ইত্যাদি। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র, বিভিন্ন বর্ণের মানুষের জন্য ছিল নিজ নিজ আবাস এলাকা। দেবতারাও এই দ্বারকাপুরীতে স্বর্গের বিভিন্ন দ্রব্য প্রেরণ করলেন। স্বর্গের পারিজাত ফুলের গাছ সেখানে স্থাপনের জন্য পাঠানো হল। বরুণদেব মনের গতিবেগ সম্পন্ন কালো রঙের কান বিশিষ্ট একটি শ্বেত অশ্ব উপহার প্রেরণ করলেন।

যাই হোক, দ্বারকাপুরী নির্মাণ শেষ হলে পর, কৃষ্ণ মথুরাবাসী ও সকল যাদবদের সেই দুর্গে প্রেরণ করে বলরামকে সেই দুর্গনগরী দ্বারকার দায়িত্ব অর্পণ করে কালযবনের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য দুর্গের বাইরে বেরিয়ে এলেন। কিন্তু কৃষ্ণ কিভাবে কালযবনকে পরাভূত করেছিলেন, সে বিষয়ের মধ্যে আজ আমরা যাব না। কেননা সেটি আরেক কাহিনী। আজ আমরা শুধু সংক্ষেপে জানলাম, শ্রীকৃষ্ণ কেন ও কিভাবে দ্বারকাপুরী নির্মাণ করেছিলেন আর সেই দ্বারকাপুরীর শোভাই বা কেমন ছিল। 

দ্বারকাপুরীর বৈশিষ্ট্য ও পৌরাণিক গুরুত্ব

দ্বারকা বা দ্বারকাপুরী শুধু একটি নগরী নয়, এটি আমাদের সনাতন ধর্মের একটি পবিত্র তীর্থক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত। জরাসন্ধ ও কালযবনের সম্মিলিত আক্রমণ থেকে যাদবদের রক্ষা করার জন্য পরমেশ্বর ভগবান-শ্রীকৃষ্ণ বিশ্বকর্মাকে দিয়ে সমুদ্রের মধ্যে এই দুর্ভেদ্য দুর্গনগরী নির্মাণ করান। পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী, দ্বারকাপুরীতে ছিল সুপরিকল্পিত রাজপথ, অসংখ্য প্রাসাদ, উদ্যান, তোরণদ্বার এবং বিভিন্ন বর্ণের মানুষের জন্য পৃথক আবাসস্থল। দেবতারাও এই নগরীকে স্বর্গীয় উপহার দ্বারা সমৃদ্ধ করেছিলেন। শ্রীকৃষ্ণের রাজ্য হিসেবে দ্বারকা আজও সনাতন, ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র ও মহা-পূর্ণস্থান হিসেবে গুরুত্ব বহন করে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ