একলব্যের গুরুদক্ষিণা: গুরুভক্তির আদর্শ নাকি গুরুর আদেশ অমান্যের কাহিনি?

একলব্যের গুরুদক্ষিণা: গুরুভক্তির আদর্শ নাকি গুরুর আদেশ অমান্যের কাহিনি?

গুরু দ্রোণাচার্যের কাছে একলব্যের গুরুদক্ষিণা প্রদান করার দৃশ্য
মহাভারতের বিখ্যাত একলব্য ও দ্রোণাচার্যের কাহিনির প্রতীকী উপস্থাপনা।

হাভারতের অন্যতম আলোচিত চরিত্র একলব্য। পৌরাণিক কাহিনীগুলোর মধ্যে একলব্যর গল্প খুবই বিখ্যাত। বিশেষত সাধারণ গল্পের বইয়ে একলব্যর কাহিনীতে তার গুরুভক্তি বা গুরু-দক্ষিণা প্রদানের কথা খুব মহৎভাবে প্রচারিত হয়ে থাকে। কিন্তু পারমার্থিক মহাজনগণ এ ব্যাপারে ভিন্ন সিদ্ধান্ত প্রদান করে থাকেন। আর সেটি তোমাদের জানাতেই আজ তোমাদের কাছে এই একলব্যর কাহিনীর অবতারণা।

দ্রোণাচার্যের কাছে একলব্যের আগমন

শ্রেষ্ঠ অস্ত্রবিদ দ্রোণ ছিলেন কুরু ও পাণ্ডব উভয় রাজপুত্রগণেরই অস্ত্র ও যুদ্ধবিদ্যার আচার্য। দ্রোণের দক্ষতা দর্শন করে শত শত অন্যান্য রাজা, মহারাজা ও রাজপুত্রগণও তাঁর কাছে অস্ত্রশিক্ষা করতে ইচ্ছুক ছিলেন। নিষাদ-রাজ হিরণ্য-ধনুর পুত্র একলব্যরও ইচ্ছে হল তিনি আচার্য দ্রোণকে তাঁর অস্ত্র-শিক্ষার গুরু রূপে বরণ করবেন। একলব্য সে কথা দ্রোণাচার্যের কাছে নিবেদন করলে পর দ্রোণাচার্য একলব্যকে তাঁর শিষ্য হবার উপযুক্ত বিবেচনা না করে ফিরিয়ে দিলেন। একলব্যর গল্পটি বর্ণনার সময় অনেক গ্রন্থে এরকম বলা হয়ে থাকে যে একলব্য যেহেতু নীচ-জাতের ছেলে ছিলেন তাই দ্রোণাচার্য তাকে গ্রহণ করেন নি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা নয়। এখানে জাতের বিচার ছিল না। বরং দ্রোণাচার্য একলব্যকে দেখে বুঝতে পেরেছিলেন বা বিবেচনা করেছিলেন যে ভবিষ্যতে এই ছেলে তাঁর কাছ থেকে অস্ত্র শিক্ষা লাভ করে সেই শিক্ষার অপপ্রয়োগ করতে পারে। দক্ষ শিক্ষক বা মহান আচার্যগণের এই ধরনের বুঝবার ক্ষমতা থাকে।

মাটির মূর্তি নির্মাণ ও গোপন সাধনা

দ্রোণ একলব্যকে ফিরিয়ে দিলেও, একলব্য যাকে মনে মনে তাঁর গুরু রূপে মেনেছিলেন, সেই গুরুর সিদ্ধান্তকে স্বীকার করলেন না। একলব্য গভীর বনে প্রবেশ করে, সেখানে দ্রোণাচার্যের অজ্ঞাতসারে এবং বিনা সম্মতিতে তাঁর এক অদ্ভুত দর্শন মাটির মূর্তি নির্মাণ করে, সেই মূর্তির সম্মুখে একাগ্রতা সহকারে ধনুর্বিদ্যার অনুশীলন করতে লাগলেন। সেই মূর্তির উপর তাঁর এক অদ্ভুত দৃঢ় বিশ্বাস ও ক্ষমতা অর্জনের অটল উদ্যোগের দ্বারা একলব্য অচিরেই ধনুর্বিদ্যার অলীক গতি ও কৌশল সমূহ রপ্ত করতে লাগলেন।

কুকুরের মুখে সাতটি তীর

একবার দ্রোণের অনুমতি গ্রহণ করে, কুরু ও পাণ্ডব রাজপুত্রগণ সেই বনে মৃগয়ার জন্য আগমন করলেন। সেইসময় পাণ্ডবদের বিভিন্ন জিনিসপত্র বহনকারীরূপে একজন লোক পাণ্ডবদের পেছন পেছন আসছিল। সেই লোকটির সঙ্গে একটি কুকুরও এসেছিল। রাজপুত্ররা নিজ নিজ লক্ষে ব্যস্ত থেকে বনে ভ্রমণ করতে থাকলে, কুকুরটি একসময় পথ হারিয়ে ফেললো বনের মধ্যে, পথ হারিয়ে ঘুরতে ঘুরতে কুকুরটি একলব্যের ধনুর্বিদ্যার সাধনাস্থলে এসে উপস্থিত হল। কৃষ্ণমৃগচর্ম পরিহিত, যত্নহীন উশকো খুশকো শরীর, কালো রঙের সেই নিষাদপুত্র একলব্যকে দেখে কুকুরটি উচ্চস্বরে ঘেউ ঘেউ করতে লাগলো। কুকুরের ঘেউ ঘেউয়ে বিরক্ত হয়ে একলব্য অতিদ্রুত, প্রায় মুহূর্তের মধ্যে এমনভাবে সাতটি শর কুকুরের মুখে নিক্ষেপ করলেন, ফলে কুকুরের মুখটি সাতটি শরে পূর্ণ হয়ে আটকে গেল। কুকুরটি আর শব্দ করতে পারল না। সে দৌড়তে দৌড়তে অবশেষে পাণ্ডুর পুত্রগণের কাছে উপস্থিত হল।

কুকুরটির এই অবস্থা দেখে পাণ্ডবগণ বিস্মিত হলেন। তাঁরা দেখলেন যে কুকুরটিকে এত তীব্রতায় তীর মারা হয়েছে যে কুকুরটির হা মুখ বন্ধ হবার সময় পর্যন্ত দেওয়া হয় নি। কুকুরটির কিছু লক্ষণ দেখে তাঁরা এও বুঝতে পারলেন যে, যে ব্যক্তি এভাবে তীর নিক্ষেপ করেছে সে কুকুরটিকে না দেখেই, কেবল শব্দ লক্ষ্য করে তীর ছুঁড়েছে। 

আরো পড়ুন: শ্রীকৃষ্ণ কেন দ্বারকাপুরী নির্মাণ করেছিলেন? জরাসন্ধ, কালযবন ও দ্বারকার রহস্য

পাণ্ডবদের সঙ্গে একলব্যের সাক্ষাৎ

পাণ্ডবরা সকলেই বিস্মিত হয়ে সেই অজ্ঞাত বনবাসী দক্ষ তীরন্দাজের প্রশংসা করলেন এবং তাঁকে দর্শনের অভিপ্রায়ে অন্বেষণ করতে লাগলেন। বনের মধ্যে ধনুর্বিদ্যার সাধনায় মগ্ন একলব্যকে তারা যখন দেখলেন তখন তাঁরাই কেউই তাঁকে নিষাদ রাজপুত্ররূপে চিনতে পারলেন না। পাণ্ডবেরা একলব্যকে প্রশ্ন করলেন, "মহাশয়, আপনার পরিচয় কি এবং আপনি কার শিষ্য?" 

উত্তরে একলব্য বললেন, 

"হে বীর যোদ্ধাগণ, আমি নিষাদ-রাজ হিরণ্যধনুর পুত্র এবং দ্রোণের একজন শিষ্য। ধনুর্বিদ্যার শ্রেষ্ঠত্বের লক্ষ্যে কঠিন অনুশীলন করছি।"

একলব্যের পরিচয় জ্ঞাত হয়ে পাণ্ডবেরা গৃহে ফিরে গিয়ে দ্রোণকে এক বিস্ময়কর কাহিনীর বৃত্তান্ত বর্ণনা করলেন। বিশেষতঃ অর্জুন একলব্যর এই বিশেষ পারদর্শীতার কথা ভাবছিলেন, যে বিদ্যা তাঁর নিজেরও জ্ঞাত ছিল না। তাই কিছুটা অভিমানী কণ্ঠে দ্রোণের স্নেহাস্পদ এই শিষ্য এক নির্জন স্থানে দ্রোণকে একলা পেয়ে একদিন বললেন, "আপনি না একদিন আমাকে স্নেহালিঙ্গন করে গুপ্তভাবে বলেছিলেন যে 'আমার কোন ছাত্রই তোমার থেকে শ্রেষ্ঠ হবে না? তাহলে কিভাবে আপনার এক শিষ্য, এক নিষাদ রাজপুত্র আমার থেকেও শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা হল? নিঃসন্দেহে সে এই জগতের যে কারুর চেয়েও শ্রেষ্ঠ।" তিনি কিছুক্ষণ ভাবলেন, তারপর তাঁর সিদ্ধান্ত হির করে নিলেন। 

গুরুদক্ষিণা হিসেবে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ

সব্যসাচী অর্জুনকে সঙ্গে নিয়ে তিনি সেই জঙ্গলে নিষাদ রাজপুত্রকে দেখতে গেলেন। সেখানে গিয়ে দ্রোণ এক অন্য একলব্যকে দেখলেন। তার সেই রাজপুত্রের বেশ নেই। তার শরীর এখন ধুলি ময়লায় দুর্গন্ধময়, তার পোশাক শত ছিন্ন, মাথায় জটাজুট আর এইভাবে সে ক্রমাগত হাতে ধনুক নিয়ে ক্রমাগত তীর নিক্ষেপ করে চলেছে।

দ্রোণকে আগুয়ান দেখতে পেয়ে একলব্য এগিয়ে এসে তার মস্তক ভূমিতে অবনত করে তার গুরুর চরণ জড়িয়ে ধরলেন। (যদিও একলব্য প্রকৃতপক্ষে সে তাঁর শিষ্য হতে পারবে না, দ্রোণের এই নির্দেশ মানেন নি, কিন্তু) এখন একলব্য প্রথা অনুযায়ী দ্রোণের অর্চনা করলেন। নিজেকে দ্রোণের শিষ্যরূপে উপস্থাপন করে একলব্য সেই শ্রেষ্ঠ আচার্যের কাছে শ্রদ্ধায় করজোড়ে দাঁড়িয়ে রইল।

দ্রোণ বললেন, "যদি সত্যিই তুমি আমার শিষ্য হয়ে থাক, তবে এক্ষুণি আমাকে তোমার গুরুদক্ষিণা প্রদান করা উচিত।" একথা শুনে একলব্য আনন্দিতভাবে বলে উঠল, "হে আমার গুরুদেব, হে শ্রেষ্ঠ বেদবিদ, আপনি আমায় আদেশ করুন, আমি আপনাকে কি প্রদান করতে পারি? এমন কিছুই নেই যা আমি আমার গুরুদেবকে প্রদান করতে পারব না।"

দ্রোণাচার্য বলেন—

 "আমাকে তোমার দক্ষিণ বৃদ্ধঙ্গুষ্ঠটি প্রদান কর।"

দ্রোণের এই ভয়ানক কথা শ্রবণ করেও, সত্য পালনার্থে একলব্য তাঁর কথা রাখলেন। নিঃশঙ্কোচ চিত্তে, উৎফুল্ল বদনে এবং দ্বিধাহীনভাবে তিনি তার দক্ষিণ বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠটি দ্বিখণ্ডিত করে দ্রোণকে প্রদান করলেন। এরপরেও একলব্য তার অবশিষ্ট আঙ্গুলের সাহায্যে ধনুর্বিদ্যা প্রয়োগ করেছেন। কিন্তু তখন তার সেই বিস্ময়কর গতি ছিল না।

বৈষ্ণব আচার্যদের দৃষ্টিতে একলব্য

সাধারণ অজ্ঞ মানুষের কাছে একলব্যের এইভাবে একাগ্রতা সহকারে দ্রোণের মূর্তি গড়ে অনুশীলন এবং বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ ছিন্ন করে গুরুদক্ষিণা প্রদান আদর্শ গুরুভক্তির পরিচায়ক। কিন্তু শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর একলব্যের এই গুরুভক্তিকে ছল গুরুভক্তি বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, যাকে গুরু রূপে স্বীকার করা হয়েছে, তিনি যে কারণেই একলব্যকে ধনুর্বিদ্যার শিক্ষা প্রদানে প্রত্যাখ্যান করুন না কেন একলব্য তার গুরুদেবের সেই প্রত্মাখ্যানের আদেশ মেনে নিতে ব্রাধ্য। গুরুর আদেশ শিরোধার্য করাটিই শিষ্যের কর্তব্য। আর সেটিই হচ্ছে আদর্শ গুরুভক্তি। কিন্তু একলব্য সেটি করে নি। প্রকৃতপক্ষে একলব্যের উদ্দেশ্যটি ছিল ধনুর্বিদ্যা শিক্ষা করে শ্রেষ্ঠ ধনুর্বিদ হওযা আর এইভাবে সে তার ইন্দ্রিয়ের সন্তোষ লাভ করতে চেয়েছিল। তাই গুরুর ইচ্ছের বা নির্দেশের কাছে সে নিজেকে সমর্পণ করতে পারে নি। বরং গুরুর নির্দেশের বিরুদ্ধ কাজ করে সে ছিল গুরুদ্রোহী। আর সেটিই ছিল তার পরম অপরাধ। ধনুর্বিদ্যায় শ্রেষ্ঠত্বের ইন্দ্রিয় সন্তুষ্টির পুরণের জন্য তার একজন সদ্গুরুর প্রয়োজন ছিল। এই জন্য দ্রোণ তাকে প্রত্যাখ্যান করার পরও সে গুরুর এক কল্পিত মাটির মূর্তি নির্মাণ করেছিল।

একলব্য কি ভক্ত ছিলেন?

গুরুভক্তি বা শ্রদ্ধার সঙ্গে গুরুর কথা মেনে নেওয়া একলব্যের কাছে প্রধান ছিল না, তার কাছে প্রধান ছিল 'আমি শ্রেষ্ঠ ধনুর্বিদ হব' এই ইন্দ্রিয় সন্তুষ্টি। তাই জাগতিক নীতিগত বিবেচনায় একলব্য তার বৃদ্ধঙ্গুষ্ঠ বিচ্ছিন্ন করে দক্ষিণা দান করলেও শ্রেষ্ঠ ধনুর্বিদ হওয়ার ইন্দ্রিয়-সন্তুষ্টির ইচ্ছাকে নিজের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে গুরুদেবের কাছে সমর্পণ করতে পারে নি। আর একটি বিষয়ের প্রতি শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন যে, একলব্য কখনও ভক্ত ছিল না। একলব্য যদি ভক্তই হোত তাহলে সে কৃষ্ণের দ্বারা সর্বদা সুরক্ষিত থাকতো। কেননা কৃষ্ণ ভক্তগণের সুরক্ষা প্রদান করেন। বরং পরিশেষে একলব্য কৃষ্ণের দ্বারা নিহত হয়েছিল। আর কেবলমাত্র অসুরেরাই কৃষ্ণের দ্বারা নিহত হয়ে থাকে।

কাহিনির প্রকৃত শিক্ষা

একলব্যের গল্প আমাদের অধ্যবসায়, নিষ্ঠা ও একাগ্রতার শিক্ষা দেয়। কিন্তু একই সঙ্গে এটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে আধ্যাত্মিক জীবনে কেবল কঠোর সাধনা যথেষ্ট নয়; গুরুর আদেশ ও নির্দেশ মেনে চলাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুও বলছেন যে কারোর বাহ্যিক আচরণ বা তপশ্চর্যা দর্শন করেই তাকে ভক্ত বলে বলে বিবেচনা করা উচিত নয়। অনেক দানব রয়েছে যারা দেবতাদের চেয়ে অধিক তপশ্চর্যা করে থাকে। কিন্তু তারা কেউই ভক্ত নয়।

উপসংহার

অতএব আমরা এবার বুঝতে পারলাম যে সাধারণ দৃষ্টিতে একলব্যর কাহিনীতে তার গুরুভক্তির কথা ভ্রান্তভাবে প্রচারিত হলেও প্রকৃত বিচারে একলব্য কখনও গুরুভক্ত ছিল না, সে ছিল তার আকাঙ্ক্ষার ভক্ত, গুরুর নির্দেশের প্রতি আত্মসমর্পণে অপরাগ এক গুরুদ্রোহী মাত্র।


আরো পড়ুন: মহাদেবের সঙ্গে ভয়ংকর যুদ্ধের পর অর্জুন কীভাবে লাভ করেছিলেন পাশুপত অস্ত্র ও সকল দিব্যাস্ত্র? | জানুন মহাভারতের সেই কাহিনী


আরো পড়ুন: শ্রী কৃষ্ণের অষ্টোত্তর শতনাম PDF ডাউনলোড করুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ